(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Friday, March 29, 2013

মনবোধ মউআর ও সামনের দীর্ঘস্থায়ী লড়াই


GANASHAKTI

মনবোধ মউআর ও সামনের দীর্ঘস্থায়ী লড়াই

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

‘দেখনেওয়ালা’ চুপ করে থাকার জন্যই ‘করনেওয়ালা’ সাহসী হয়। কেউ অনৈতিক কাজ করলে দশজনে যদি তার কান মুলে দেয় তাহলে কেউ আর অনৈতিক কাজ করবে না।

এই সহজ কথাটি সাহসের সঙ্গে বলতেন মহারাজগঞ্জের মনবোধ মউআর।

মনবোধ মউআর এক গ্রাম্য বৃদ্ধ কৃষক। ঘন শ্যামবর্ণ তাগড়া স্বাস্থ্য। ঘাড়টা মোটা, চ্যাপ্টা হাত পা। গলার শিরাগুলো ফুটে উঠেছে। টান টান মুখ, পাথরের মতো শক্ত। বোঝা যায় যৌবনে পালোয়ানি করতেন।

গ্রামের ভিতরে যেখানে যা কিছু অন্যায় তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটাই ছিল তাঁর স্বভাব। বিশেষ করে তাঁর গ্রামে বিভিন্ন সংসারের ভিতরে ও সমাজের বাইরে মহিলাদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনিই মুখ খুলতেন। আর এই মুখ খোলার জন্যই গোটা গ্রাম যেন তাঁর শত্রু। গ্রামের হাজারটা অন্যায় সবাই দেখছে, কেউ কেউ বুঝছে কিন্তু কেউ ঝামেলায় যেতে চায় না। বরং মনবোধ মউআরকেই সকলে যত অশান্তির মূল বলে মনে করে। গ্রামের হুজ্জোৎ এসে পড়ে মউআরের পরিবারের উপরেও। কিন্তু তবু মউআর শুধু আর ‘দেখনেওয়ালা’ হয়ে থাকতে রাজি নন।

মনবোধ মউআর কোনও সত্যিকারের মানুষ নন। একটি গল্পেরই প্রধান চরিত্র। গল্পের নামই ‘মনবোধ মউআর’। লেখক মিথিলেশ্বর।

হিন্দি গদ্যসাহিত্যে সমাজ বাস্তবতার যে সূচনা একদা প্রেমচন্দ্‌ এবং সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী ‘নিরালা’ সূচিত করেছিলেন, তাঁদের সেই ধারাটিকে পরবর্তী সময়ে প্রসারিত করেছিলেন রাহুল সাংকৃত্যায়ন, রাঙ্গেয় রাঘব, নার্গাজুন, ফনীশ্বরনাথ রেণু, যশপাল প্রমুখ। তাঁদেরই উত্তাধিকার বহন করে চলেছেন মিথিলেশ্বর। যাঁর রচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু গ্রামীণ ভারতবর্ষের প্রান্তিক জনসমাজ।

মিথিলেশ্বরের হিন্দি গল্প সংকলনের বাংলা অনুবাদ ‘স্ত্রী-জন্ম ও অন্যান্য গল্প’ পড়ার সুযোগ হলো সম্প্রতি। অনুবাদক সমর চন্দ। প্রকাশক ‘প্রথমত’। কার্যত একক উদ্যোগেই দীর্ঘদিন ধরে হিন্দি সাহিত্যের প্রগতিশীল ধারার গল্প-উপন্যাস বাংলায় অনুবাদ করে চলেছেন সমর চন্দ।

পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, কোথায় আছি আমরা? আমাদের এই ভারতের গ্রামে আজ‍‌ও মনে করা হয় 

‘জাহু হম জনিতী ধিয়ওরা কোঁখীরে জনমিহে।

পিহি‍‌‍‌গেঁ মে মরিচ করাই রে। 

মরিচ কে ঝাকে-ঝুকে ধিয়ওরা মরি জাইতি,

ছুটি জাইতে গরুওয়া সন্তাপ রে।’

যদি জানতাম আমার গর্ভে কন্যা জন্মাবে,

তাহলে মরিচ ঝরিয়ে খেতাম। মরিচের

ঝাঁঝে কন্যা মারা যেত। গভীর সন্তাপ দূর হতো।

(ভোজপুরী লোকগীতি/স্ত্রী জন্ম)

গল্পগুলির কাঠামো অন্যরকম। অনেকটা সাংবাদিকতা-সুলভ সহজ বর্ণনার কাঠামো। ভাষার পরীক্ষা-নিরীক্ষা নেই। গল্পের মোচড়ও নেই সর্বত্র। কিন্তু যে নির্মম বাস্তবকে তিনি তুলে ধরেন তা পাঠককে চমকে দেয়। বিশেষ করে মহিলাদের উপর সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার তাঁর কলম। প্রশ্ন জাগে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা? 

পড়ছিলাম আর মনে হচ্ছিল এসব গল্প ক’জন পড়েন? পড়ার পরও সমাজের পরিবর্তনই বা হচ্ছে কই?

এই নিয়েই কথা হচ্ছিল এক প্রবীণ সহকর্মীর সঙ্গে। তিনি বলেছিলেন, সামন্ততান্ত্রিক শোষণ-শাসন নির্মূল করাটা শুধু গল্পকার-ঔপন্যাসিকদের একার কাজ নয়। তারজন্য দরকার বিরাট-ব্যাপক প্রত্যক্ষ লড়াই। সেই লড়াইয়ে অবশ্যই এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার প্রেমচন্দ্‌ , শরৎচন্দ্রেরা। আর সামন্ততন্ত্রের আর্থিক ভিত্তি ভেঙে দুর্বল হয়ে গেলেও তার মূল্যবোধ সহজে যায় না। সেই মূল্যবোধের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখতে হয় অবিরত। আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গে জমিদারি, জোতদারি ব্যবস্থা আর নেই। কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধকে কি আমরা নির্মূল করতে পেরেছি? তাই যদি হতো তাহলে কেন এখনও এত মহিলাদের উপর অত্যাচার হয়? কেন হয় বধূ হত্যা? কেন এরাজ্যে এখনও ডাইনি অপবাদে খুন করা হয়? তিনিই বলছি‍‌লেন, কী হবে গল্প লিখে, কী হবে প্রবন্ধ লিখে, কী হবে ফিচার লিখে এসব মনের মধ্যে কখনও স্থান দেবেন না। গজেন মিত্রের ‘কলকাতার কাছেই’ উপন্যাসের কি কোনই প্রভাব নেই আমাদের সমাজে? আশাপূর্ণা দেবীর ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ অথবা ‘সুবর্ণলতা’ পড়ে কি একটাও সুবর্ণলতা তৈরি হয়নি মনে করছেন? বিস্তীর্ণ হিন্দি বলয়ে কোথাও যদি সামন্ততান্ত্রিক সমাজ শোষণের বিরুদ্ধে, মহাজনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এতটুকু লড়াই হয় তবে জানবেন তার পিছনে কোথাও না কোথাও কোনভাবে মুন্‌শী প্রেমচন্দ্‌ আছেনই। 

আমরা যারা একটু আধটু বামপন্থী সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত আছি তাদের মনের মধ্যেও এ প্রশ্ন বারে বারে উঁকি দেয়, কী হবে লিখে? পড়ছে ক’জন? সমাজটাই বা বদলাচ্ছে কোথায়? বহু মানুষের মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। তাদের দুঃখ যন্ত্রণার কথা সাধ্যমত লিখছিও। সেই অগণিত মানুষের ভীড়ে কোন একজনের কথা হয়ত আর আলাদা করে মনেও থাকে না। যাঁদের কথা লিখছি তাঁরা যদি বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা বা অন্ধ্রপ্রদেশের কেউ হন তবে তো আমার গণশক্তিতে প্রকাশিত লেখা পড়ার কোন সুযোগই নেই। এমনও মনে হয় এসব লেখালিখি ছেড়ে তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়াই। পরমুহূর্তেই বুঝি তাঁদের পাশে লড়াই করার মানুষ আছেন। আরো মানুষ আসবেন। তাঁদের কাছে লড়াইয়ের বাতা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের কাজ।

এই তো দেশজুড়ে সংগঠিত হলো জাঠা। আগামীদিনে বড় লড়াই হবে। সেই লড়াইয়ের আগাম বার্তা দিতে সি পি আই (এম)-র উদ্যোগে জাঠা প্রায় গোটা দেশই ছুঁয়ে গেল। দিল্লির রামলীলা ময়দানে হলো বিরাট সমাবেশ। সর্বভারতীয় খবরের কাগজ বা টেলিভিশন চ্যানেল এ খবরকে চেপে গেছে। আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ খবরের কাগজ ও টিভি চ্যানেলও উপেক্ষা করেছে।

অতএব ভরসা সেই গণশক্তি। নিজেরাই নিজেদের ঢাক পেটাতে চাই না। কিন্তু ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গণশক্তির প্রতিবেদকরা এই পরিক্রমার দীর্ঘ সময় ধরে গোটা দেশের খেটেখাওয়া ভারতবাসীর দৈনন্দিন সংগ্রামের কথা তুলে ধরলেন তা কি একেবারেই বৃথা যাবে? তাঁদের প্রতিবেদন থেকেই তো জানা গেল অনুপগড়ের জলের জন্য সংগ্রামের কাহিনী, বিহারের নওয়াদা জেলার দোনা পঞ্চায়েতের ডকনাপুর গ্রামের কৃষক রামসাগর রামের দাবি, গোয়ালিয়রের রাজনীতিতে রাজবংশের দাপট ভাঙার লড়াই, লহেরিয়াসরাইয়ের ঝুপড়িবাসীর জীবন, হনুমানগড়ে ধান আবাদী জেলার জন্য লড়াই, কালাহান্ডি থেকে রামলীলা ময়দানে আসা মানুষ, তামিলনাডুর বস্ত্রশিল্পের শ্রমিক জীবনের যন্ত্রণা। 

অনেকে বলবেন সি পি আই (এম)-র কর্মসূচী অতএব, সি পি আই (এম)-র মুখপত্রে তা বিস্তারিত লেখা হবে এতে আর বলার কি আছে?

কিন্তু যে দাবি নিয়ে এই জাঠা তা সি পি আই (এম) উত্থাপন করলেও তা কি জনসাধারণের, জ্বলন্ত সমস্যাগুলির ন্যায্য দাবি নয়? জমি ও বাস্তভিটার অধিকার, খাদ্যের অধিকার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকার, সামাজিক সুবিচারের অধিকার এবং বল্গাহীন দুর্নীতি বন্ধ করার দাবিগুলি কি জনগণের দাবি নয়? এই জাঠা থেকে কি দাবি ওঠেনি মহিলাদের উপর অত্যাচার বন্ধ কর, সংসদে মহিলাদের জন্য এক তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ কর?

দেশের মানুষ তো প্রত্যক্ষ করলেন ভোটের প্রয়োজন ছাড়াই গরিব ও প্রান্তিক মানুষদের দাবি নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছে একটা পার্টি। তার নাম সি পি আই (এম)। প্রকাশ কারাত থেকে সীতারাম ইয়েচুরি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বার বার বলেছেন, এই জাঠার সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক নেই। আমরা জনগণের দাবি নিয়ে বিকল্প পথের রাস্তা তৈরি করতে চাই। লড়াইয়ের ময়দানেই সে বিকল্প তৈরি হবে। 

আগামীদিনে আ‍‌রো বড় লড়াই শুরু হবে। সমাজের পরিবর্তন কোন দৈব-নির্দিষ্ট অবধারিত ভবিতব্য নয়। সচেতন সক্রিয় উদ্যোগেই সমাজের পরিবর্তন আনতে হয়। এ অনেক দীর্ঘস্থায়ী লড়াই। কঠিন লড়াই। সংসদের ভিতরে লড়াই, সংসদের বাইরে লড়াই আঘাত দিলে আঘাত আসবে। রক্ত ঝরবে। দুর্বল হৃদয়ের জায়গা নেই এখানে। এতে সাফল্য আসবে ব্যর্থতা আসবে। আবার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন লড়াই শুরু হবে। কেবলমাত্র ভোটবাক্সের নিরিখে এ লড়াইয়ের সাফল্য ব্যর্থতার হিসেব-নিকেশ করলে ভুল হবে।

অনেক মনবোধ মউআরেরা আছেন আমাদের চারপাশে। তাঁদের পাশে টানার কাজে এখন।


No comments:

Post a Comment