(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Wednesday, March 27, 2013

ভোট-নির্ঘণ্টে জেলার বিন্যাস পালটাতে বাধ্য হলো রাজ্য


ভোট-নির্ঘণ্টে জেলার বিন্যাস
পালটাতে বাধ্য হলো রাজ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি

কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে এখনও জট কাটেনি 

কলকাতা, ২৬শে মার্চ— নিজেদের অবস্থান থেকে সরকার কিছুটা পিছু হটলেও রাজ্যে পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের সঙ্ঘাত মিটছে না। জেলাবিন্যাস নিয়ে জট কিছুটা খুললেও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা নিয়ে দুই পক্ষের জটিলতা এখনও কাটেনি। এদিনই রাজ্য সরকারের তরফে কমিশনকে পাঠানো চিঠিতে প্রথম দফার ভোটে দক্ষিণবঙ্গের ১১টি জেলা ও দ্বিতীয় দফায় মুর্শিদাবাদ এবং উত্তরবঙ্গের ৫টি জেলায় পঞ্চায়েত ভোটের নয়া নির্ঘন্টের কথা জানানো হয়েছে।

রাজ্য সরকারের চিঠি প্রসঙ্গে এদিন রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সচিব তাপস রায় সাংবাদিকদের জানান,‘‘ রাজ্য সরকার কিছুটা হলেও তার সিদ্ধান্ত বদল করেছে। জেলাবিন্যাসের পরিবর্তন করেছে।’’ কিন্তু পঞ্চায়েত ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সচিবের জবাব ছিলো,‘‘ বিধানসভা নির্বাচনের সময় ৬৭৫কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী এরাজ্যে মোতায়েন করা হয়েছিলো বলে আমরা শুনেছি। এবার আমরা ৮০০কোম্পানি চেয়েছিলাম। তারমধ্যে ৩০০কোম্পানি চেয়েছি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন। তারপর যে দফাভিত্তিক ভোট হবে সেইমতো কেন্দ্রীয় বাহিনীকে কাজে লাগানো হবে। আমরা কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার কথাই সরকারকে বলেছি।’’

জেলাবিন্যাসের জট কিছুটা খুললেও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা নিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে কমিশনের অবস্থানের এখনও কোনো রফার আভাস নেই। এদিন কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে মহাকরণে রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী সুব্রত মুখার্জির বক্তব্য ছিলো,‘‘আমাদের আমলে কেন্দ্রীয় বাহিনী ছাড়াই ১১টি পৌরসভার ভোট করেছি। প্রত্যেকটি জায়গায় যাতে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা যায় তার ব্যবস্থা করবো। প্রয়োজনে অন্য রাজ্য থেকে পুলিস আনা হবে।’’ এমনকি কমিশনের গতকালের ১১পাতার চিঠিকে ‘অবান্তর’, ‘স্কুল বয়দের মতো’ বলে আক্রমণ করে সুব্রত মুখার্জি বলেন,‘‘ ভারতের যে কোনো রাজ্যের থেকে পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা ভালো।’’ ফলে, কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে দু’তরফের সঙ্ঘাতের পরিবেশ এখনও রয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। 

মঙ্গলবার সন্ধ্যাতেই নির্বাচন কমিশনের চিঠির জবাব রাজ্য সরকার পাঠিয়ে দিয়েছে। সেই চিঠিতেই রাজ্য সরকার নিজের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসে। আগে একতরফাভাবে দু’দফার ভোটের জেলাবিন্যাসের যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছিলো এদিন কমিশনকে পাঠানো চিঠিতে কার্যত রাজ্য সরকার পিছু হটে। গত ২২শে মার্চ রাজ্যে সরকারের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিলো, ২৬শে ও ৩০শে এপ্রিল দুই দফার ভোটে দ্বিতীয় দফায় (৩০শে এপ্রিল) মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুর এই তিন জেলায় ভোট হবে। রাজ্য সরকার এদিন যে চিঠি নির্বাচন কমিশনকে পাঠিয়েছে তাতে দু’দফার ভোটের দিনক্ষণ একই রেখে জেলাবিন্যাসের ক্ষেত্রে রদবদল করার কথা জানানো হয়েছে। 

যার অর্থ, রাজ্য সরকার এখন সিদ্ধান্ত নিল, ২৬শে এপ্রিল (প্রথম দফা) হাওড়া, হুগলী, দক্ষিণ ২৪পরগনা, উত্তর ২৪পরগনা, নদীয়া, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বর্ধমান এই ১১জেলায় পঞ্চায়েত ভোট অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় দফায় (৩০শে এপ্রিল) রাজ্য সরকার মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার এই ছয় জেলায় পঞ্চায়েত ভোট করতে চায়। এদিন সরকারের এই সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে পঞ্চায়েতমন্ত্রী সুব্রত মুখার্জি মহাকরণের প্রেস কর্নারে জানান,‘‘ সরকারের তরফ থেকে আজকেই আমরা এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠির উত্তর পাঠাচ্ছি।’’ কিন্তু ঘটনা হলো, সুব্রত মুখার্জি প্রথমে সাংবাদিকদের কাছে মুর্শিদাবাদ জেলাকে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলির সঙ্গে ভোটগ্রহণের জন্য বলেছিলেন। পরে অবশ্য তাঁর দপ্তর থেকে জানানো হয়, মুর্শিদাবাদ জেলার ভোট হবে দ্বিতীয় দফায়। ফলে, কংগ্রেস পরিচালিত তিন জেলা পরিষদের ভোট কিন্তু একই দিনেই বহাল থাকছে।

গত ২২শে মার্চ রাজ্য সরকার একতরফাভাবে পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিলো তখনই জেলাবিন্যাস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিলো। বিরোধী দল থেকে আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ সব মহলেই রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠে যায়। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান রক্ষা করতে কোনো যুক্তিতেই রাজ্য সরকারের দু’দফার ভোটের জেলাবিন্যাসের সিদ্ধান্ত মানা সম্ভব ছিলো না। রাজ্য সরকারকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে গত সোমবারই রাজ্য নির্বাচন কমিশনার মীরা পাণ্ডে রাজ্য সরকারকে চিঠি দেন। জেলাবিন্যাস পরিবর্তন করে নির্বাচন কমিশনের কাছে পিছু হটলেও কেন্দ্রীয় বাহিনী সহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে এখনও সরকারের সঙ্গে কমিশনের জটিলতা রয়েই গেছে।

গতকাল কমিশনের চিঠি পাওয়ার পর রাজ্য সরকারের হাবভাবের পরিবর্তন ছিলো চোখে পড়ার মতো। গতকাল পর্যন্ত কমিশনের বিবেচনার চিঠিকে পাত্তা না দেওয়ার অবস্থায় এদিন সরকারের ছিলো না। মহাকরণ সূত্রের খবর, এদিন নির্বাচন কমিশনের সচিব মীরা পাণ্ডের সঙ্গে রাজ্যপালের দীর্ঘ বৈঠকের পর সরকারের টনক নড়ে। রাজ্যপালের কাছ থেকে কোনো বার্তা পেয়েই রাজ্য সরকারের এই অবস্থান বদল বলে মনে করা হচ্ছে। এদিন দুপুরেই মহাকরণে মুখ্যমন্ত্রীর ও রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন সুব্রত মুখার্জি। পরে নিজের ঘরে দীর্ঘক্ষণ পঞ্চায়েত সচিবের সঙ্গে সভা সেরে বিকাল সাড়ে ৩টা নাগাদ প্রথমবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন পঞ্চায়েতমন্ত্রী। নির্বাচন কমিশনকে একতরফাভাবে আক্রমণের ফাঁকে তখনই সুব্রত মুখার্জি জানিয়ে দেন,‘‘ দু’দফাতেই ভোট হবে। ওই দিনেই হবে। এইভাবেই চিঠির খসড়া প্রস্তুত করে আরও একবার আলোচনা করে কমিশনকে চিঠি পাঠানো হবে।’’ সেই আলোচনাতেই জেলাবিন্যাস নিয়ে সরকারের আগের সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনার কথা জানান পঞ্চায়েতমন্ত্রী। এরপরই নিজের ঘর থেকে বের হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসে পড়েন সুব্রত মুখার্জি। মুখ্যমন্ত্রীর ঘর থেকে বেরিয়ে বিকাল ৪টা ৫০মিনিটে মহাকরণের প্রেস কর্নারে সাংবাদিক সম্মেলন করে সুব্রত মুখার্জি জেলা পুনর্বিন্যাসের নয়া কাঠামো হাজির করেন। এদিন সন্ধ্যাতেই রাজ্যপাল তলব করেন রাজ্যের মুখ্যসচিব সঞ্জয় মিত্রকে। সেখানেও রাজ্যের পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে সরকারের সঙ্গে সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশনের সঙ্ঘাতের বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়েছে বলে খবর। 

২২শে মার্চ একতরফাভাবে একবার পঞ্চায়েতের জেলাভিত্তিক দিনক্ষণ ঘোষণার পর কেন রাজ্য সরকারকে ফের তা তিনদিনের মাথায় বদল করতে হলো তার কোনো যুক্তিসম্মত জবাব রাজ্য সরকারের তরফ থেকে এদিন মেলেনি। রাজ্য সরকার কি কমিশনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করলো? সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের উত্তরে সুব্রত মুখার্জি জানান,‘‘ আমরা সবসময় নতিস্বীকার করছি। আমরা দুর্বল।’’দ্বিতীয়বার সভা করতে যাওয়ার আগে সুব্রত মুখার্জি যে ভাষায় কমিশনকে আক্রমণ করেছিলেন পরে সাংবাদিক সম্মেলন করতে এসে সেই ঝাঁঝ উধাও। প্রেস কর্নারে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন,‘‘ সরকারের তরফ থেকে আজই আমরা কমিশনকে চিঠি পাঠাচ্ছি। সেই চিঠিতে আমরা ভালো করে নির্বাচন করতে চাই বলে জেলা পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’‘ সরকার কি তার অবস্থান থেকে সরে এলো? জবাবে সুব্রত মুখার্জি জানান,‘‘ আমরা তো প্রথমে একদফাতেই ভোট করতে চেয়েছিলাম। সেখান থেকে সরে এসে দু’দফায় রাজি হয়েছি। এখন জেলা পুনর্বিন্যাসও করলাম। আমরা চাই নির্বাচন হোক।’’ কিন্তু নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে একটি কথাও আর বলেননি পঞ্চায়েত মন্ত্রী। 

সবমিলিয়ে রাজ্যে এই প্রথম পঞ্চায়েত ভোট ঘিরে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এদিন সি পি আই (এম) নেতা রবীন দেবের নেতৃত্বে রাজ্য বামফ্রন্টের এক প্রতিনিধিদল মীরা পাণ্ডের সঙ্গে দেখা করেন। রাজ্যে অবাধ, শান্তিপূর্ণ পঞ্চায়েত ভোটের জন্য কমিশনের কাছে দাবি জানায় রাজ্য বামফ্রন্ট


No comments:

Post a Comment