(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Friday, March 15, 2013

নন্দীগ্রামের বর্ণপরিচয় ১৪ই মার্চের পাতায়


নন্দীগ্রামের বর্ণপরিচয় ১৪ই মার্চের পাতায়

চন্দন দাস

নন্দীগ্রাম থেকে জঙ্গলমহল হয়ে মহাকরণ — এই তো ছিল রুট। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে গেছেন তৃণমূল নেত্রী। কিন্তু কেমন আছে স্টার্টিং পয়েন্ট?

সেদিনের বিরোধী দলনেত্রী আজ মুখ্যমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বটে। 

কিন্তু কেমন আছে নন্দীগ্রাম? ১৪ই মার্চের ছ’ বছর পূর্তির দিনে এই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক, সন্দেহ নেই। পাশাপাশি আরো একটি প্রসঙ্গ আজ আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নন্দীগ্রাম থেকে ওঠা ‘পরিবর্তন’-র স্লোগান বাস্তবায়িত হয়েছে। রাজ্য এগলো না পিছলো — ইতোমধ্যেই তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেছে। কিন্তু সেই তথাকথিত বদলের ডাকের মঞ্চ ছিল নন্দীগ্রামই। নন্দীগ্রামের একটি নির্দিষ্ট মডেল আছে। সেই মডেলে বিরোধীদের মিছিল, সভা অনুমোদিত নয়। করলে মারধর, হামলা, ঘর পোড়ানো, রক্তপাত নিশ্চিত। সেই মডেলে একটি দলের পতাকা ছাড়া আর কিছুই গ্রাহ্য নয়। সেই মডেলে প্রবল দুর্নীতি, পক্ষপাত দেখেও গ্রামবাসীদের কথা বলার সুযোগ নেই। সেই মডেলে শাসক দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে, হানাহানিতে আতঙ্কিত, শশব্যস্ত সমাজ অবধারিত। সেই মডেল, ‘নন্দীগ্রাম মডেল’ এখন রাজ্যে নন্দীগ্রামের সীমানা পেরিয়ে আরো অনেক জায়গায় বিস্তৃত। 

২০০৭-র ১৪ই মার্চের ঘটনার পর রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি যে তথ্যগুলি প্রচার করেছিলেন, সেগুলির পক্ষে যুতসই, মোক্ষম প্রমাণ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির পরিচালনাধীন রাজ্য প্রশাসন কতটা হাজির করতে পারলো? প্রায় দু’ বছর হয়ে গেলো মমতা ব্যানার্জির মুখ্যমন্ত্রিত্বের। ২০০৭-র ১৪ই মার্চ ওঠা প্রশ্নগুলির জবাব কতটা মিললো?

এখন নন্দীগ্রামকে সামনে রেখে হিসাব নিকেশ মিলিয়ে নেওয়ার দিন।

২০০৯-র ১৪ই মার্চ নন্দীগ্রামের হাজরাকাটায় তিনি বলেছিলেন, ‘২০০৭-র ১৪ই মার্চের পর থেকে অনেকে নিখোঁজ, ওই দিন অনেকের চোখ কেমিক্যাল দিয়ে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিলো।’ কারা তাঁরা? স্বরাষ্ট্র তথা মুখ্যমন্ত্রী কী এখন তা জানাতে পারেন?

আমরা, রাজ্যের সব অংশের মানুষ অনেক কিছুই জানতে চাই। প্রথমত, মনে আছে ১৪ই মার্চ যে ১৪জন মারা গেলেন নন্দীগ্রামে, তাদের মধ্যে একজনের পরিচয় আজও জানা যায়নি। কে তিনি? তমলুক সদর হাসপাতালে তার দেহ দীর্ঘদিন ছিলো। জেলা প্রশাসন অপেক্ষা করেছিলো— যদি কেউ শনাক্ত করেন, এই আশায়। কেউ যাননি। তৃণমূলের কোন সাংসদ, বিধায়ক, নেতা আজ পর্যন্ত জানাননি লোকটির পরিচয়। মমতা ব্যানার্জি এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানাবেন আমাদের সেই লোকটির পরিচয়? মানুষটি কী বাইরে থেকে ভাড়া করে আনা সশস্ত্র হামলাকারীদের একজন, যার নাম বলা যায় না, যাকে চিনতে পারা যায় না। যাকে আনা হয়েছিলো ১৪ই মার্চ মহিলা, শিশু-কিশোরদের পিছন থেকে পুলিসকে লক্ষ্য করে গুলি, বোমা মারার জন্য? দ্বিতীয়ত, ১৪ জন মারা গেছিলেন ১৪ই মার্চ, ২০০৭-এ — নন্দীগ্রামের দুটি জায়গায়, ভাঙাবেড়া সেতুর সামনে এবং গোকুলনগরে। তৃণমূলের প্রচার ছিলো পুলিসের গুলিতেই ১৪জন মারা গেছেন। কিন্তু পুলিসের গুলির আঘাত পাওয়া গেছিলো ৮জনের দেহে। বাকিদের মধ্যে ৪জনের দেহে ছিলো বোমার আঘাতের চিহ্ন। ২জনের দেহে পাওয়া গেছিলো তীক্ষ্ণ অস্ত্রের আঘাত। বোমা ছুঁড়লো কারা? পুলিস কী বোমা ব্যবহার করে? তীক্ষ্ণ অস্ত্রই বা কারা চালালো? তবে কী গ্রামবাসীদের পিছন থেকে যারা পুলিসের উপর হামলা চালাচ্ছিলো, তারাই ছুটতে থাকা গ্রামবাসীদের খুন করলো? কেন? লাশের দরকার ছিল খুব? মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী জানাবেন? তৃতীয়ত, ১৪ই মার্চের দুপুর থেকেই নানা প্রচার হয়েছিল তৃণমূলের মাধ্যমে। মমতা ব্যানার্জি প্রচার করেছিলেন, বহু শিশুর পা চিরে তালপাটি খালের জলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। অনেক মহিলা ধর্ষিতা হয়েছেন। অনেকে খুন হয়েছেন। তাদের দেহ নাকি ট্রলারে করে নিয়ে গিয়ে দূরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পা চিরে ফেলা সেই শিশুদের দেহ কোথায়? ১৪ই মার্চ বা তার পরে কোনোদিন একটি ঐ রকম শিশু পাওয়া যায়নি — না জলে না গ্রামে। একটি শিশুরও নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ কোথায়? গত ছ’ বছরে না হোক, গত দু’ বছরে এমন কোন অভিযোগ কী মমতা ব্যানার্জির প্রশাসন, পুলিস পেয়েছে? আমরা জানতে চাই। অনেক মহিলা ধর্ষিত হওয়ার যে প্রচার চালানো হয়েছিলো তারও কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলো কী? ২০০৯-এও এক সাংবাদিক সম্মেলনে আমরা মমতা ব্যানার্জিকে বলতে শুনেছিলাম,‘আমি জানি আরো অনেক লোক খুন হয়েছেন।’ কিন্তু তারা কারা? তাদের নাম কী? তারা কী নন্দীগ্রামের লোক? নাকি ঐ ১৪তম ব্যক্তির মতোই রহস্যময়? দু’ বছরেও কোন প্রশ্নেরই জবাব দিলেন না মমতা ব্যানার্জি।

সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগড় — সর্বত্র বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন মানিক মণ্ডল। মাওবাদীদের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারীর বিশেষ পরিচিত মানুষটি সম্প্রতি একটি বই প্রকাশ করেছেন। নিজের নাম নিয়েছেন ‘মানিক ফকির’। সেই বইয়ে প্রবল সি পি আই(এম) বিরোধিতা, ‘পরিবর্তন’-র অন্যতম অনুঘটক মানিক মণ্ডল নন্দীগ্রামে কিভাবে তৃণমূল-মাওবাদী চমৎকার বোঝাপড়ায় কাজ করেছে তা তুলে ধরেছেন। মানিক মণ্ডলের দাবি, তথ্য কী ভুল? তিনি কী আদ্যোপান্ত মিথ্যুক? তৃণমূল জবাব দেয়নি। মামলা হয়নি। কেন? 

এই প্রসঙ্গেই নন্দীগ্রাম নিয়ে সি আই ডি-র নথিগুলি একবার আমাদের মনে পড়ে যায়। স্বাভাবিক। সি আই ডি-র গোয়েন্দারা এই নথি যখন তৈরি করেছিলেন তখন রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এখন মমতা ব্যানার্জি। সি আই ডি এবং রাজ্য পুলিসের তৎকালীন অফিসার, কর্মীদের সিংহভাগ এখনো রাজ্য পুলিসে আছেন — কয়েকজন বেশ উচ্চপদেই আছেন। মমতা ব্যানার্জি তাঁদের সেদিনের নথিকে চ্যালেঞ্জ করছেন না কেন? নন্দীগ্রামে মাওবাদীদের উপস্থিতির বর্ণনা উঠে এসেছিল তৃণমূল সাংসদ কবীর সুমনের বই ‘নিশানের নাম তাপসী মালিক’-এ। এমনকি মাওবাদী হিসাবে যাঁরা বিচারাধীন, তাঁদের সঙ্গে ই এম বাইপাসের ধারে, তৃণমূল ভবনে মমতা ব্যানার্জির বৈঠকের খবরও আমরা পেয়েছিলাম সেই বইয়ে।

মমতা ব্যানার্জি কোন বিরোধিতা করেননি। আর আজ রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরেরই মন্ত্রী তৃণমূল নেত্রী। তারই অঙ্গুলিহেলনে চলে সি আই ডি। সেই সি আই ডি এবং এস টি এফ-কে কী জানিয়েছিল মাওবাদী নেতা সুদীপ চোঙদার ওরফে কাঞ্চন? তৃণমূলের প্রায় ৬০ জন কর্মীকে পিস্তল, রাইফেল চালানো শেখাতে নন্দীগ্রামে ২টি প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করেছিল মাওবাদীরা। দুটি শিবিরই হয়েছিল সোনাচূড়ায়। দুটি শিবিরেই ‘ট্রেনার’( শিক্ষক) হিসাবে উপস্থিত ছিলো মাওবাদী স্কোয়াড লীডার রঞ্জিৎ পাল। শিবির দুটি তৃণমূলের নেতাদের সাহায্য, সহযোগিতাতেই হয়েছিল — কাঞ্চন তাও স্বীকার করেছে।

সেই রিপোর্ট কী মমতা ব্যানার্জির সরকার অস্বীকার করছে? গত প্রায় দু’ বছরে তেমন কিছু আমরা শুনিনি। তাহলে সবই সত্যি।

তাঁর দলের স্লোগান কী হবে? লোকসভা নির্বাচনের আগে দলের ইশ্‌তেহার নন্দীগ্রামের মাটিকে ঠেকানোর সভায়, ২০০৯-র ১৪ই মার্চ মমতা ব্যানার্জি ঘোষণা করেছিলেন — ‘আমাদের স্লোগান হবে ‘প্রতি পেটে ভাত চাই। প্রতি হাতে কাজ চাই।’ তা কিভাবে হবে তা সেদিন তিনি বলেননি। শুধু বলেছিলেন, ‘বাইরের রাজ্য থেকে সব ছেলেকে রাজ্যে ফিরিয়ে আনবো। আর নন্দীগ্রামকে সোনায় মুড়ে দেবো আমরা। সব আইডিয়া আমাদের আছে।’

সেই আইডিয়ায় গত দু’বছরে কী হলো? নন্দীগ্রাম সোনায় মুড়ে যায়নি। জেলিঙহ্যামের চরে রেলের কারখানার শিলান্যাস হয়েছিল। কারখানা হয়নি। ২০১২-র ১৪ই মার্চ মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, জেলিঙহ্যামে রেল, সেইল আর রাজ্য সরকার মিলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক করবে। তার আগে ২০১১-র ৪ঠা ফেব্রুয়ারি হলদিয়ায় রেলমন্ত্রী হিসাবে তিনি জেলিঙহ্যামে রেলের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানার শিলান্যাস করেন। কিন্তু রেল বাজেটে ওই কারখানার জন্য কোন টাকা বরাদ্দ ছিল না। ২০১২-র ২৫শে মে মহাকরণে মুখ্যমন্ত্রী জানান, নন্দীগ্রামের কারখানায় ২০১ কোটি ৬০লক্ষ টাকা বিনিয়োগ হবে, তৈরি হবে বছরে ১০হাজার রেলের বগির কাপলার, চাকরি হবে ৩০২ জনের। কিন্তু তার কোন দেখা নেই।

নন্দীগ্রামে রেললাইনের ঘোষণাও হয়েছিল। রেললাইন যায়নি। ২০১২-র ১৪ই মার্চ নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রী সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের শিলান্যাস করেছিলেন। সেই হাসপাতাল? হয়নি। কিষান মাণ্ডি? তার দেখা নেই রাজ্যের কোথাও। স্বাভাবিক ভাবেই নন্দীগ্রামেও হয়নি। নন্দীগ্রামে স্টেডিয়ামের ঘোষণা ছিল। না, তাও হয়নি। যে নন্দীগ্রামে কৃষিজমি রক্ষা নিয়ে এত কাণ্ড, বামফ্রন্টকে নিকেশ করার এত ‘অভিযান’, মাওবাদীদের ক্যাম্প, মাইন পোঁতা, সেই নন্দীগ্রামেই এখন সরকারী ধান কেনা অনিয়মিত।

তাহলে নন্দীগ্রামের কী ‘পরিবর্তন’ হলো? কিছু তো হয়েইছে। নন্দীগ্রাম ২০০৭-র জানুয়ারি থেকে ‘মুক্তাঞ্চল’ হয়ে উঠেছিল। তখন ছিল মাওবাদী-তৃণমূল-কংগ্রেস-জামাতে উলেমায়া হিন্দ-এস ইউ সি-নকশালদের মিলিত শক্তির অধিকৃত এলাকা। ছ’ বছর পরে, এই বসন্তে তা শুধুই তৃণমূলের ‘মুক্তাঞ্চল’। সেখানে কারো পতাকা তোলার অধিকার নেই। মিছিলের অধিকার নেই। সভা তো অনেক দূরের কথা। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকবার তৃণমূলের নেতাদের আক্রমণে রক্তাক্ত হয়েছেন কংগ্রেসের নেতারা। অর্থাৎ প্রথমে যা সি পি আই(এম)-কে নিকেশের উদ্দেশ্যে পরিচালিত বলে কেউ কেউ উল্লসিত হয়েছিলেন, এখন সেই ‘অভিযান’ সব দলের বিরুদ্ধে উদ্যত।

পঞ্চায়েতে পঞ্চায়েতে তৃণমূল কর্মীদের একচ্ছত্র প্রতাপ। ফলে ইতোমধ্যেই শাসক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। ইন্দিরা আবাস যোজনার ঘর থেকে একশো দিনের কাজের প্রকল্প — গ্রামোন্নয়নের সব কাজে দুর্নীতির অভিযোগ। সেই দুর্নীতির থেকে অবধারিত গ্যাংগ্রিন দেখা দিয়েছে — শাসক দলের নিদারুণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। যা একাধিকবার হানাহানি পর্যন্ত গড়িয়েছে। 

আপাতত মুখ খোলার সাহস নেই নন্দীগ্রামের। ঘরছাড়া অনেকে। যাঁরা আছেন, মুখ বুজে আছেন — একটি সুযোগের অপেক্ষায়। আজকের নন্দীগ্রাম থেকে সেই বার্তাই আসছে।

নন্দীগ্রাম তাই এক শিক্ষা। ১৪ই মার্চ তার পাথেয়।

No comments:

Post a Comment