(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Tuesday, March 19, 2013

LONG LIVE HUGO CHAVEZ - PRAKASH KARAT


সাভেজ দীর্ঘজীবী হোন!

প্রকাশ কারাত

ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি হিসেবে চতুর্থবারের জন্য পুনর্নির্বাচিত হওয়ার ছ’মাসের মধ্যেই প্রয়াত হলেন বিপ্লবী নেতা উগো সাভেজ। ২০০১সালের জুন থেকে ভুগছিলেন ক্যান্সারে। শেষে সেই ক্যান্সার কেড়ে নেয় ৫৮বছর বয়সী নেতার জীবন, যিনি লাতিন আমেরিকার বামপন্থার নতুন ঢেউয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর জীবনাবসানে শোকে ভেঙে পড়েছে ভেনেজুয়েলাসহ লাতিন আমেরিকা। তাবৎ দুনিয়ার বামপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তিগুলির কাছে এক বিরাট ক্ষতি।

সাভেজ এমন একটা সময় মারা গেলেন যখন তাঁকে দরকার ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০১২সালের অক্টোবর মাসে ৫৫শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ের পর ২০১৩-১৯, ছ’বছরের আরও একটি মেয়াদ তাঁর রাষ্ট্রপতি থাকার কথা ছিল — যে বিপ্লবী প্রক্রিয়া তিনি শুরু করেছিলেন তাকে সংহত করা এবং লাতিন আমেরিকার আঞ্চলিক ঐক্য নির্মাণে যে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তা আর হলো না।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ১৪বছরে উগো সাভেজ যে-কাজ সাফল্যের সঙ্গে করেছেন, তা আক্ষরিক অর্থেই অসাধারণ। এর দু’টি অভিমুখ রয়েছে। একটি অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্র, ভেনেজুয়েলার মধ্যে। অন্যটি বৈদেশিক ক্ষেত্রে, লাতিন আমেরিকা এবং সাধারণভাবে বিদেশনীতির প্রশ্নে। 

নয়া উদারবাদের বিকল্প

ভেনেজুয়েলায় নয়া-উদার মডেলের একটি বিকল্প পথ নির্মাণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন সাভেজ। যে সাফল্য তিনি অর্জন করেছেন, তা তাঁকে তামাম লাতিন আমেরিকার বামপন্থীদের জন্য আকর্ষণের একটি শক্তিশালী কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। ১৯৯৯সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাভেজ প্রথম যেটা শুরু করেন, তা হলো একটি নতুন সংবিধান গ্রহণের কাজ। যা প্রকৃত অর্থেই মানুষের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। ২০০২সালে তাঁর বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান গণঅভ্যুত্থানে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি দেশের তেল সম্পদের প্রশ্নে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ব্রতী হন। ভেনেজুয়েলায় রয়েছে দুনিয়ার বৃহত্তম তেল সঞ্চয়। দেশের দাপুটে তেল সংস্থা পি ডি ভি এস এ-কে নিয়ে আসেন সরকারী নিয়ন্ত্রণে। পশ্চিমের তেল সংস্থাগুলিকে কঠোর শর্ত পালনে বাধ্য করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের ব্যাঙ্কগুলিতে চিরায়ত তেল রপ্তানিকারক দেশগুলির পেট্রো ডলার রাখার প্রথাকে অস্বীকার করেন। পরে জাতীয়করণ করেন বিদ্যুৎ ও টেলিকম শিল্পকে। 

ভূমিসংস্কার কর্মসূচী রূপায়ণ করেন। সবমিলিয়ে ৩০লক্ষ হেক্টর জমি হাজার হাজার কৃষকের মধ্যে বণ্টন করেন। 

সাভেজের পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল তেল থেকে আসা আয়কে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা। মিশন রবিনসন, সুক্রের মতো বেশ কয়েকটি সামাজিক প্রকল্প শুরু করেন। দক্ষিণ আমেরিকার মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নিরক্ষরতা দূরীকরণ থেকে মানুষের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও আবাসনের জন্য নেন একাধিক কর্মসূচী। এইসব জনমুখী নীতিগুলির ফলাফল ছিল তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। বলিভারীয় সাধারণতন্ত্রে এই সময়ে দারিদ্র্য কমেছে অর্ধেক। দারিদ্র্যের হার ১৯৯৯সালে ছিল ৪২.৮শতাংশ। ২০১১সালে তা কমে হয়েছে ২৬.৫শতাংশ। চরম দারিদ্র্যের হার এই সময়ে কমেছে ৭০শতাংশ। ১৬.৬শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৭শতাংশ। নিরক্ষরতা দূরীকরণ হয়েছে। শিক্ষকের সংখ্যা ৬৫,০০০থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,৫০,০০০। 

স্বাস্থ্য অভিযানে তৈরি হয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নেটওয়ার্ক। শুরু থেকেই এই কেন্দ্রগুলিতে রয়েছেন ১৪,০০০কিউবার ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী। এখানে মেলে প্রথম শ্রেণীর স্বাস্থ্য পরিষেবা।

ইউ এন ডি পি’র তথ্যে নয়ের দশকে ভেনেজুয়েলা মানে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বেশি অসাম্যের সমাজ। এখন সবচেয়ে কম। 

মানুষের হাতে ক্ষমতা — নিয়ে এসেছে এই বিরাট সামাজিক পরিবর্তন। বলিভারীয় বিপ্লবী প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে ৩৫,০০০প্রাদেশিক পরিষদ। তৃণমূলস্তরে পপুলার সংগঠনগুলিকে নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি নেটওয়ার্ক। সাভেজ বুঝেছেন দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা। মুভমেন্ট ফর দি ফিফথ রিপাবলিককে তিনি পরিণত করেছেন একটি রাজনৈতিক দলে — ইউনাইটেড সোস্যালিস্ট পার্টি। 

সাভেজ ও তাঁর বিপ্লবী প্রক্রিয়াকে — বৃহৎ ব্যবসা, অভিজাত ও আমলাতন্ত্রের উচ্চস্তর নিয়ে গঠিত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী (অলিগার্কি)-র ধারাবাহিক বৈরিতা ও আক্রমণের মুখে পড়তে হয়। তাদের পিছনে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিদেশী পুঁজির মদত। এই ঘৃণা বিদ্বেষ তীব্র হয় যখন সাভেজ সেনাবাহিনীকে একটি পপুলার জাতীয়তাবাদী শক্তিতে পরিণত করেন। শ্রমজীবী মানুষ এবং সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থনে সাভেজ তাঁর বিপ্লবী প্রক্রিয়াকে স্তব্ধ করে দেওয়ার একের পর এক ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করেন।

বৈদেশিক ক্ষেত্রে কিউবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলেন সাভেজ। ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবী মতাদর্শকে তিনি অবলম্বন করেন। এবং দ্রুত তা সাফল্যের সঙ্গে প্রয়োগ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলা সাহায্য করে লাতিন আমেরিকার বামপন্থার অগ্রগতিতে। ১৯৯৮সালে তাঁর প্রথম জয়ের পর বামপন্থীরা জেতেন ব্রাজিল, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, উরুগুয়ে, এল সালভাদোর, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়াসহ অন্যান্য দেশগুলিতে।

লাতিন ঐক্য গঠনে ভূমিকা

সাভেজ ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন সাইমন বলিভারের সেই আদর্শকেই, যে আদর্শে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একটি ঐক্যবদ্ধ লাতিন আমেরিকা গঠনের কথা। সাইমন বলিভার ছিলেন স্পেনীয় শাসন থেকে দক্ষিণ আমেরিকার মুক্তিদাতা। প্রথমেই সাভেজ লাতিন আমেরিকার আটটি দেশকে নিয়ে তৈরি করেন আলবা (বলিভারিয়ান অ্যালায়েন্স অব দি পিপলস অব আমেরিকা)। আটটি দেশের মধ্যে ভেনেজুয়েলা, কিউবা ও বলিভিয়াই মূল চালিকাশক্তি, যারা শুরুতে আলবা নির্মাণের পদক্ষেপ নেয়। আলবার সাফল্যের পর তৈরি হয় ইউনাসুর। এবং সর্বশেষে তাঁর প্রধান পদক্ষেপ — ২০১১সালের ডিসেম্বরে কারাকাসে, লাতিন ও ক্যারিবিয়ান দেশগুলিকে নিয়ে তৈরি করেন সেলাক। এই সমস্ত আঞ্চলিক মঞ্চেরই বাইরে রাখা হয় উত্তর আমেরিকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে। 

সাভেজের উদ্যোগেই তৈরি হয় ব্যাঙ্ক অব সাউথ, অভিন্ন টেলিভিশন স্টেশন টেলিসুর, স্বীকৃত অভিন্ন মুদ্রা সুক্রে। আর এসবই আঞ্চলিক সহযোগিতার ফসল। জোরদার হয় লাতিন ঐক্য। হাইতির মতো গরিব ক্যারিবীয় দেশগুলিতে সুলভে তেল সরবরাহের জন্য সাভেজ তৈরি করেন পেট্রোক্যারাইব। 

সর্বোপরি, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার এক অটুট জোরদার বন্ধন তৈরি করেন সাভেজ। যা কিউবাকে ওই কঠিন সময়ে খুবই সাহায্য করে। কিউবা থেকে শেষবারের মতো বিদায় নেওয়ার সময় ফেব্রুয়ারির ১৭তারিখে তাই ফিদেল সাভেজকে এক চিঠিতে লিখছেন, ‘সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিপর্যয় এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার ধারালো ছুরি দিয়ে কিউবার বিপ্লবকে রক্তাক্ত করতে চেয়েছিল, সেই সময়ে বিভক্ত আমেরিকার অপেক্ষাকৃত ছোট একটি দেশ হয়েও ভেনেজুয়েলা কিউবাকে উদ্ধার করে সেই বিপদ থেকে।’ 

বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি

এটাই ছিল সাভেজের বিপ্লবী, আন্তর্জাতিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। সাভেজের বৈদেশিক নীতির মূল কথা ছিল একটিই : সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের হাত থেকে কী করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা যায়, যাতে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়।

২০০৪সালের ডিসেম্বরে কারাকাসে আমি সাভেজের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। প্রায় একঘণ্টার সেই বৈঠকে সাভেজ বলেছিলেন কীভাবে তিনি দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা, জোট-নিরপেক্ষ বিদেশনীতিকে আবার প্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা করছেন। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর নিজের মতামতও ব্যক্ত করেছিলেন আমার কাছে। সাভেজ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন তাঁর পরবর্তী ২০০৫সালে ভারত সফর সম্পর্কে, বিশেষ করে কলকাতায় আসার ব্যাপারে। 

একুশ শতকে উগো সাভেজের মতো পৃথিবীর কোনও রাজনৈতিক নেতাই বিশ্বকে একটা নতুন ধারায় চালনা করার দিশা দেখাতে পারেননি। 

ভেনেজুয়েলার বামপন্থী ও পপুলার ফোর্সগুলি সাভেজের দেখানো আদর্শ ও পথেই চলতে বদ্ধপরিকর। স্বাভাবিকভাবেই আগামীদিনে শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে তাঁরা পড়বেন। আমাদের সক্রিয় সমর্থন সংহতি, ও একাত্মতা প্রতিটি পদক্ষেপে সবসময় তাঁদের সঙ্গেই থাকবে।

No comments:

Post a Comment